নদী ভাঙনে বিলীন মৌলভীবাজারের শতাধিক ঘর-বাড়ী

0
94
শেওয়াইজুরী এলাকায় নদী ভাঙনের দৃশ্য
আবুল হায়দার তরিকঃ দুই কিয়ার জেগাত আমার এখান বাড়ী আছিল, গাঙ্গো তাকি বালি তোলায় ভাঙ্গিয়া নিছে গিয়া। এখন আমরা রাস্তার ধারো পলিথিনর বেড়া দিয়া থাকি। বউ পোয়া পুরি লইয়া থাকতে, পেসাব-পায়খানা করতে কষ্টের সীমা থাকে না। আমার সব আরাইয়া আমি এখন নিরাশ্র। এভাবেই বলছিলেন মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আখাইলকুড়া ইউনিয়নের শেওয়াইজুরী গ্রামের উমর আলী।

 

ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন হচ্ছে
বালু উত্তোলনের কারণে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আখাইলকুড়া ইউনিয়নের শেওয়াইজুরী, চানপুর, সোমারাই, আমুয়া এলাকার শতাধিক ঘর বাড়ী সর্বগ্রাসী মনু নদীর করালগ্রাসে বিলীন হয়ে গেছে। মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে আরো ৪০-৫০ টি ঘর-বাড়ী। এই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার মধ্যে মসজিদ, মন্দির ছাড়াও পানি সেচ প্রকল্প ও উন্নয়ন বোর্ডের নদী প্রতিরক্ষা বাঁধও রয়েছে।
বালু উত্তোলন বন্ধ না করলে আরো ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমতাবস্থায় গত ২১ জুলাই মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আখাইলকুড়া ইউনিয়নের শেওয়াইজুরী, চানপুর, সোমারাই, আমুয়া এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসক বরাবরে আবেদন করা হয় এবং গত ২ আগস্ট হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন করা হয়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ ৭৫ ফুট গভীর ও ৪০ ইঞ্চি পাইপ লাগিয়ে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বিগত ৫-৬ বছর থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। আর তখন থেকেই নদী ভাঙনের শুরু হয়। একে একে শতাধিক ঘর-বাড়ী নদী গর্বে বিলীন হয়ে গেছে এবং প্রতি নিয়ত ভাঙনের মধ্যেই রয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে ভয়াবহ ক্ষতির সম্ভাবনা দৃশ্যমান।

 

একটি পাকা শৌচাগার নদীতে হেলে পড়ছে, পাশে একটি টিউবয়েল
সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায় এলাকার অনেক গুলো পাকা, আধা পাকা, বেশ কয়েকটি ঘরের অর্ধভাগ নদীগর্বে বিলীন হয়েগেছে। কাঁচা বাঁশের ঘর ও শৌচাগার গুলোও বিলীন হচ্ছে নদী গর্বে। মসজিদ, মন্দিরও আছে ভাঙনের তালিকায়। তার মধ্যে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন চলছে। এমন পরিস্থিতিতে নিরুপায় অত্র এলাকার ভুক্তভোগী কয়েকটি গ্রামের মানুষ।
এসময় চানপুর গ্রামের নিবারন বর্মন, আজাদ মিয়া, লিটন মিয়া, হরে কৃষ্ণ বর্মন, শেওয়াইজুরী গ্রামের গোপাল দাস, প্রিয়তুষ দাস, উমর আলী ও সোমারাই গ্রামের জুনেদ মিয়া বলেন বালু উত্তোলনের কারণে আমরা এখন ভিটেবাড়ী হারা, আমরা তাদের বাঁধা দিলে মাস্তান নিয়ে আমাদের হুমকি দেয়। এখান থেকে অবৈধভাবে বালু তোলে শেরপুর নিয়ে যায়। আমাদের অভিযোগ কেউ শুনে না। প্রশাসনও আমাদের সুখ-দুঃখের কথা শুনে না। দিন দিন নদী ভাঙনে আমরা নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছি।

 

আখাইলকুড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোঃ শামীম আহমদ বলেন অত্র এলাকায় ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের ফলে ৭০-৮০ টি ঘর-বাড়ী নদী গর্বে বিলীন হয়েগেছে, মসজিদ, মন্দির তো গেছেই, এখন মনু সেচ প্রকল্প এবং নদী প্রতিরক্ষা বাঁধ মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বালু উত্তোলন চলতে থাকলে অবশিষ্ট ঘর-বাড়ী, রাস্তাঘাট, সেচ প্রকল্প, বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধ বিলীন হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।
ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন হচ্ছে
আখাইলকুড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোঃ সেলিম আহমদ বলেন অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে অনেক নিরাশ্রয় হয়েছে, গত ২-৩ বছরে শত ফুটের মত নদী ভেঙ্গে বিপদজনক অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বালু উত্তোলন বন্ধ না করলে পরিস্থিতি আরো ভয়ানক হবে।

 

নদী ভাঙন সম্পর্কে পানি উন্নয়ন বোর্ড মৌলভীবাজার এর নির্বাহী প্রকৌশলী নরেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী বলেন, শেওয়াইজুরী, চানপুর, সোমারাই এলাকা পরিদর্শন করে জেলা প্রশাসককে গত ২৫ জুলাই লিখিত প্রতিবেদন প্রদান করেছি। এই এলাকা সহ কুলাউড়া ও রাজনগর উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ স্থান সমূহ সিসি ব্লক দ্বারা স্থায়ীভাবে প্রতিরক্ষামূলক পকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। আশাবাদী এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরনে সচেষ্ট হবো। তবে বালু উত্তোলন বন্ধ করতে হবে। এব্যাপারে প্রশাসন কিছু উদ্যোগ নিয়েছে।

LEAVE A REPLY