অঘোষিত আরেক সম্রাট ব্রাদার সাদেক : রাজ্য ওসমানী মেডিকেল

0
38
বিডিজাগরণ২৪.কমঃ ইসরাইল আলী সাদেক। বর্তমান ঠিকানা নগরীর কাজল শাহ। বাংলাদেশ নার্সেস এসোসিয়েশন (বি.এন.এ) সিলেট এম.এ.জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল শাখার সাধারণ সম্পাদক। পেশায় একজন স্টাফ নার্স বা ব্রাদার হলেও ওসমানী হাসপাতালের সকল কিছুর নিয়ন্ত্রক তিনি। সেইসাথে তিনি হাসপাতালের বড় বড় সকল প্রকল্পের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রক। মূল ফটকের পাশের রেস্টুরেন্ট, ন্যায্যমূল্যের ঔষধের দোকান, এম্বুলেন্স স্ট্যান্ড সবই সাদেকের দখলে। হাসপাতাল থেকে অর্জিত টাকা দিয়ে শহরেই জায়গা কিনে শহরেই গড়ছেন বিশাল অট্টালিকা। ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলেও ওসমানী হাসপাতালে বলতে গেলে তার ইশারা ছাড়া কলম নড়ে না।
হাসপাতালের যন্ত্রপাতি কেনার প্রকল্পে দুর্নীতি থেকে শুরু করে, সিট ভাড়া দিয়ে টাকা আদায়, হাসপাতালের সরকারি ঔষধ বাইরে বিক্রি করে কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। নার্স হিসেবে হাসপাতালের উন্নয়নকল্পে গঠিত কোন কমিটি বা টেন্ডার কমিটিতেই থাকার সুযোগ নেই তার। কিন্তু কমিটির বাইরে থেকেও চলে তার অভিনব কারসাজি। ‘সাদেকের ইশারায় চলে নাটাই, উড়ে আকাশে ঘুড়ি’ এ প্রবাদটিও তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাদ পড়েনি নারী কেলেঙ্কারির ঘটনাও।
প্যাথিড্রিনসহ আটক : সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাত ৯ টা ২০ মিনিটের সময় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের মোগলাবাজার থানার অন্তর্ভুক্ত আলমপুর থেকে তাকে ১০টি প্যাথিড্রিন ইনজেকশনসহ আটক করে র‍্যাব-৯। এরপর শুক্রবার ভোরে মোগলাবাজার থানায় তাকে হস্তান্তর করে র‍্যাব, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে তার বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করে। যার নং-৪।
থানায় হস্তান্তরের সময় জব্দ হিসেবে ১০টি পাথিড্রিনসহ তাকে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মোগলাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আকতার হোসেন। তিনি বলেন- র‍্যাবের পক্ষ থেকে তাকে থানায় হস্তান্তরের পর সিলেটের মহানগর হাকিম ২য় আদালতে তাকে প্রেরণ করা হয়েছে।
যেভাবে সাদেক বনে যান আওয়ামী লীগ : সাদেক একসময় ছিলেন বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নার্সিং ইন্সটিটিউটে পড়ালেখা শেষ করে ২০১৩ সালে চাকরিতে যোগদান করেন, তার প্রথম কর্মক্ষেত্র হয় শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতাল (সদর হাসপাতাল)। এরপর ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে বিভিন্ন তদবিরের মাধ্যমে নার্স হিসেবে যোগ দেন ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। নতুন কর্মস্থলে এসে তৎকালীন বিতর্কিত স্টাফ নার্স রেখা বনিকের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন। আওয়ামী লীগের অনুসারী বিতর্কিত এ নার্সের হাত ধরেই খোলস পালটে আওয়ামী লীগার বনে যান সাদেক। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতাদের মিটিং মিছিলে যোগদান ও ছবি তোলার মাধ্যমে অল্পদিনে হয়ে যান নেতাদের আস্থাভাজন। এরপর নানা পট পরিবর্তনে রেখা বনিকের ক্ষমতায় ভাটা পড়ে।
পরবর্তীতে সাদেক হয়ে যান নার্সেস এসোসিয়েশন ওসমানী মেডিকেল শাখার সাধারণ সম্পাদক। পদবী পাওয়ার পর তাকে আর থামায় কে? পরে ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে নতুন কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক হয়েই শক্ত খুঁটি গাড়েন তিনি। এখন তার ফেসবুক ওয়াল থেকে শুরু করে বাসার বিভিন্ন দেয়ালে ঝুলছে মন্ত্রী, এমপি ও সরকারদলের বিভিন্ন নেতার সাথে তোলা ছবি।
প্রথমে ওসমানীতে বদলির পর হাসপাতালের তৎকালীন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুস সবুরের সময়ে খুব বেশি একটা সুবিধা করতে না পারলেও জেনারেল সবুরের বদলির পর হাসপাতালের পরিচালক হন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুল হক। তখন রেখা বনিকের মাধ্যমেই সাদেক নতুন এ পরিচালকের বিশ্বস্ত হয়ে ওঠেন। আর এই বিশ্বস্ততাকেই পুঁজি করেন সাদেক হয়ে ওঠেন ওসমানী মেডিকেলের তুরুপের তাস।
যেভাবে গড়ে তোলেন সাম্রাজ্য : অভিযোগ আছে সিলেটের সরকারদলের বিভিন্ন নেতাদের প্রভাব ও তৎকালীন এ পরিচালকের নাম বিক্রি করে সাদেক ওসমানী হাসপাতালে গড়ে তোলেন দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য। সামসুদ্দিন সদর হাসপাতালে কর্মরত থাকা অবস্থায় ওসমানী হাসপাতাল প্রাঙ্গণের অভ্যন্তরে ‘ন্যায্যমূল্যের ঔষধের দোকান’ ভাড়া নিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও মাহবুবুল হক এর সময়ে নিজের হাসপাতালের মূল ফটকের পাশের রেস্টুরেন্টটিও দখলে নেন তিনি। এমনকি নিজের পরিচিত জনের ২/৩ টি এম্বুলেন্স রাখার কথা বলে হাসপাতাল প্রাঙ্গণের অভ্যন্তরেই একটি এম্বুলেন্স স্ট্যান্ডের অনুমতি নেন। যেখানে প্রতিদিন থাকে কম পক্ষে ৪০ থেকে ৫০ টি এম্বুলেন্স। এ এম্বুলেন্স স্ট্যান্ড থেকে এম্বুলেন্স প্রতি বড় অংকের টাকাও পান তিনি। শুরুতে এ স্ট্যান্ডে অন্যদের এম্বুলেন্স থাকলেও এখন এখানে তার নিজেরই প্রায় ৩০ থেকে ৩৫টি এম্বুলেন্স থাকে। অনেক সময় হাসপাতালের এম্বুলেন্স বিকল দেখিয়ে কেবল এম্বুলেন্স ব্যবসার বিনিময়ে মাসিক লক্ষ লক্ষ টাকা তিনি কামান।
এখানেই শেষ নয়। তার বিরুদ্ধে আছে নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ। ২০১৭ সালে তার বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠে। তখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে তাকে শোকজ করা হলেও পরে রহস্যজনকভাবেই তিনি থেকে যান বহাল তবিয়তে।
তার দুর্নীতির তথ্য ভাণ্ডার আছে আরো বিশাল। ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ বিভিন্ন বিভাগ থেকে যন্ত্রপাতির চাহিদা সংগ্রহ করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দেড়শ কোটি টাকার একটি চাহিদাপত্র পাঠায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সে তালিকা থেকে ২৮ কোটি টাকায় প্রায় ৪৭ ধরণের যন্ত্রাংশ কিনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু অল্পমূল্যের এসব যন্ত্রপাতির প্রায় ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি মূল্য দেখিয়ে ঠিকানাবিহীন লাপাত্তা ২টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে সেখান থেকেও কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেন ইসরাইল আলী সাদেক। যন্ত্রাংশ কেনার ক্ষেত্রে কোথাও তার কোন লিখিত সম্পৃক্ততা না থাকলেও একটি গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে দুর্নীতির এ ভয়ঙ্কর তথ্য। গণমাধ্যমের এ অনুসন্ধানে প্রশ্নের মুখোমুখি হন হাসপাতালের সাবেক উপ-পরিচালক বর্তমান সিলেট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. দেবপদ রায়। কিন্তু তেমন কোন সদুত্তর তিনিও দিতে পারেননি।
ইসরাইল আলী সাদেক একটি সরকারি হাসপাতালের নার্স হওয়া স্বত্বেও গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকা সাদেক একাই ভোগ করতেন নাকি সে টাকা সিঁড়ি বেয়ে উপরেও উঠতো এমন প্রশ্ন সাধারণ জনগণের। সূত্রঃ সিলেটভয়েস

LEAVE A REPLY