শিশুদের প্রতি যত্নশীল হতে হবে : বন্ধ করতে হবে শিশু নির্যাতন

0
121
খায়রুন নাহারঃ নিয়মিত ভাবেই দেশে শিশু নির্যাতনের প্রতিযোগিতা চলছে। পরিবার থেকে শুরু করে গ্রামে কিংবা শহরে বেড়েই চলছে শিশু নির্যাতন। এটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কেননা জাতিকে মেধা শূন্য করতে শিশু নির্যাতনই যথেষ্ট। এজন্য আমাদের শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে এখনই এগিয়ে আসতে হবে।
বিশেষত বাবা-মা বা অন্য কোন অভিবাবক দ্বারা কোন শিশুর প্রতি শারীরিক, যৌন, বা মানসিক দুর্ব্যবহার করা বা শিশুকে অবহেলা করা। বাবা-মা বা অভিবাবক পর্যায়ের কারো কোন কার্য বা অসম্পুর্ণ কোন কার্য দ্বারা কোন শিশু সত্যিকারভাবে বা ধীরে ধীরে ক্ষতির সম্মুখীন হওয়াই শিশু নির্যাতন। সেটা হতে পারে বাড়িতে, কোন প্রতিষ্ঠানে, স্কুলে, কোন সম্প্রদায়ে যেখানে শিশুটি অবস্থান করে।
শিশু নির্যাতন নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চার ধরনের মতবাদ দিয়েছে। ১. শারীরিক নির্যাতন, ২. যৌন নির্যাতন, ৩. মানসিক নির্যাতন এবং ৪. অবহেলা জনিত নির্যাতন।
এথেকে বুঝা যায় আমরা একটি অস্থির সময় অতিক্রম করছি। কোথাও কোনো একটি নৃশংস ঘটনা ঘটলে তার পরপরই আমরা চেতনা নিয়ে ঝাপিয়ে পরি। কিছু দিন পর চেতনা ক্লান্ত হয়, আমরা আয়েশ করি। একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটার আবার আমরা চেতনা জাগ্রত করি। এমন পরিস্থিতির কারনেই সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও বিকৃত মানসিকতার কারণে অপরাধকারীরা নৃশংস ও নির্মম অপরাধের অনুকরণ করে অসুস্থ বিনোদনে মেতে উঠছে সমাজ। সাম্প্রতিক সময়ে শিশু নির্যাতনের বেশ কিছু ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে।
এই ঘটনাগুলোতে শিশুদের প্রতি নির্দয় ও নিষ্ঠুর আচরণ প্রকাশ পেয়েছে। সিলেটে রাজন হত্যা এবং  বরিশালে সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত সরকারি শিশু সদনে দুই শিশুর ওপর অমানসিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। আবার প্রায় একই সময় সাতক্ষীরায় দুটি শিশুকে গাছের সঙ্গে বেঁধে পিটিয়ে আহত করা হয়। আবার সামান্য রেষারেষি, বিরোধ, প্রতিহিংসার ফল হিসেবে হবিগঞ্জে ঘটনাটা ঘটল, মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় নির্যাতনে শিশুর মৃত্যূ হলো। নির্যাতনকারিরা একেবারে নরম বস্তু হিসেবে শিশুদের পায়। শিশুরা প্রতিরোধ করতে পারে না। তাই তাদের আহত করা সহজ। মানুষ যখন এমন প্রতিহিংসায় মেতে ওঠে, তারা কিন্তু একবারও ভাবে না, এর ফল কী হবে? এর একমাত্র কারণ তারা ভয় পায় না। অপরাধ করার পর শাস্তি হচ্ছে না। অপরাধ বাড়ার এটিও একটি অন্যতম কারণ।
একজন যে অপরাধ করছে তার কোনো প্রত্যক্ষ ফলাফল মানে অপরাধীকে শাস্তি দিতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। যদি শিশু হত্যার মতো অমানবিক কাজের শাস্তি দৃষ্টান্তমূলক হতো তাহলে অপরাধীরা ভয় পেত। অপরাধের শাস্তি প্রতিষ্ঠা করা না গেলে এসব থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না। শিশুকে নির্যাতনের পর হত্যা করে একজন হত্যাকারী কোনোভাবেই রেহাই পেতে পারে না। দেশের প্রচলিত আইনে হত্যাকারীদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু তার উল্লেখ্য যোগ্য কোন প্রয়োগ নেই।
আইনে আছে দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩০২ ধারা অনুযায়ী হত্যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং তদুপরি অর্থদণ্ড। আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতিতেও শিশুদের সুরক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ ১৯৮৯ অনুযায়ী শিশুদের বেঁচে থাকার অধিকার স্বীকৃত। বাংলাদেশে আমরা এর যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু এসব আইন থেকে কী হবে? আমরা তো প্রয়োগ করতে পারছি না।
রাজনের হত্যার শাস্তিটাও এমন হলো। সন্ত্রাসীরা শিশুকে নির্যাতনের দৃশ্য ভিডিওতে নিল। অপরাধীরা জায়গা পরিবর্তন করল, সেটা একটা আলাদা ধারা হওয়ার কথা কিন্তু তা হলো না। এখানে ৩০৭ ধারা মানে যেটা গুরুতর অপরাধ, ৩২৪ ধারা হলো আবার লঘু অপরাধ। লঘু অপরাধ আর গুরু অপরাধ একসঙ্গে দেওয়া যায় না। এসব দেওয়ায় কেসটা দুর্বল হয়ে গেল। পরে ইস্যুর আড়ালে ধামাচাপা পরে যায়, বিচার হীনতার সংস্কৃতি জাহির থাকে।
এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরেণর জন্য বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। প্রকৃত অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন তার সঠিক বিচার করতে হবে। এজন্য আইনের শত ভাগ প্রয়োগ করতে হবে। মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত মানুষের পক্ষেই কেবল শিশুদের প্রতি নৃশংস আচরণ করা সম্ভব, আর এই মানসিকতার উন্নতি করতে পারে পরিবার। তাই পরিবার ও সমাজকে সচেতন করতে হবে। কেননা দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ উন্নয়নে শিশু নির্যাতন বন্ধ করা অপরিহার্য হয়ে দাড়িয়েছে। কারণ এরাই আগামী পৃথিবীর কর্ণধার। এদেরকে সুন্দর, মননশীল ও নমনিয় পরিবেশের মাধ্যে গড়ে বেড়ে ওঠার সুযোগ দিতে হবে।
লেখকঃ খায়রুন নাহার, শিক্ষক

LEAVE A REPLY