জুন থেকেই বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের মহামারী চলছে

417
চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া মহামারী করোনাভাইরাস ইতিমধ্যে বিশ্বের ২১৩ টিরও বেশী দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, যুক্তরাজ্য সহ বেশ কয়েকটি দেশে করোনা সংক্রমণ এবং মৃত্যু সারা বিশ্ববাসীকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলে।
চীনের প্রাণহানি সেই সব দেশের মত না হলেও সারা বিশ্ববাসী জানে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) চীনা ভাইরাস।
কিন্তু বাংলাদেশ এই করোনা ভাইরাস ইতালিয়ান ভাইরাস হিসেবে প্রবেশ করে। তার কারণ হিসেবে বলা যায় ইতালির একটি ফ্লাইটে যে বাংলাদেশী প্রবাসীরা দেশে এসেছিলেন, তারা কোয়ারান্টাইন না মেনে সংক্রমণ ছড়িয়েছেন। গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। এর পর এপ্রিল, মে অতিক্রম করে জুনের মধ্যভাগ থেকে বাংলাদেশে মহামারী আকার ধারণ করে। কিন্তু বাংলাদেশের করোনাভাইরাস শনাক্ত করণ পরীক্ষার ব্যবস্থা প্রয়োজনের তুলনায় নগন্য হওয়াতে সঠিক আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা শুধু দেশবাসীর কাছে নয়, বিশ্ববাসীর কাছেও অধরাই থেকে যাচ্ছে।
জুলাইয়ে এসে দেশের সবকয়টি এলাকায় প্রতি ঘরে ঘরে সংক্রমণ ছড়িয়েছে। যেখানে পরীক্ষার ব্যবস্থা সচরাচর নয় সেখানে আবার ফি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। যার কারণে অনেকেই পরীক্ষা না করিয়ে সাধারণ টেলি মেডিসিন বা ফার্মাসিস্ট এর পরামর্শে ঔষধ সেবন করে সেরে উঠছেন। অনেকে সাধারণ সর্দী জ্বর গোপন করছেন লোক নিন্দার ভয়ে। সেই ভয়ে করোনা উপসর্গ নিয়ে অনেক বয়স্কদের মৃত্যু হচ্ছে। কারো কারো নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হচ্ছে আবার কারো কোন নমুনাই নেয়া হয় নি। পরিবার পরিজন নিয়ে দাফন বা সৎকার সেরেছেন নিজেদের মত করে।
এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ৯ লক্ষ ৪০ হাজার ৫ শত ৫২ জনের এবং এতে করোনা ভাইরাস পজেটিভ শনাক্ত হয়েছেন ১ লক্ষ ৮৩ হাজার ৭ শত ৯৫ জন।
এ-থেকে ধারণা করাই যায় ৯ কোটি ৪ লক্ষ মানুষের নমুনা পরীক্ষা করলে এই সময়ে ১ কোটি ৮৩ লক্ষ মানুষের করোনা পজিটিভ পাওয়া যেতো। পরীক্ষা ব্যবস্থা সহজলভ্য না হওয়ায়, পরীক্ষার পরিমাণ কম হওয়ায় সংক্রমণ ছড়াচ্ছে বেশী। এজন্যই অধরা ধুম্রজালে বাংলাদেশের করোনাভাইরাস সমীকরণ।
ধারণা করা হচ্ছে জুলাই মাসের প্রথম দিকে বাংলাদেশের ১৮ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৯ কোটি জনসংখ্যা করোনা সংক্রামিত হয়েছে, যার বৃহৎ একটি অংশ নিজের থেকেই ভালো হয়েছে, আর কেউ কেউ সাধারণ ঔষধ সেবন করে সুস্থ হয়েছেন।
প্রতিটি পরিবারের দু-তিন জন আক্রান্ত হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফল দিতে কালবিলম্ব এবং তা পর্যাপ্ত না হওয়ায় বিশাল একটা অংশ কোন ধরনের পরীক্ষা ছাড়াই করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে ছড়িয়ে সুস্থ হয়েছেন। অনেকের কোন উপসর্গই ছিলো না। নির্দ্বিধায় সংক্রমণ ছড়িয়ে বেড়িয়েছেন এই উপসর্গ হীনরা।
অথচ বাংলাদেশের করোনাভাইরাস শনাক্ত ও মৃত্যুর সমীকরণ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিন একই হার বজায় রেখে যাচ্ছে। নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষা, শনাক্ত ও মৃত্যুর সমীকরণ দীর্ঘদিন যাবত একই হারে চলছে। যা নমুনা সংগ্রহ তার পরীক্ষা যদি করা হয়, তাহলে দশ থেকে পনের দিনে পরীক্ষার ফলাফল আসবে কেনো? এমন প্রশ্ন দেশের ১৮ কোটি মানুষের। অনেকেই মন্তব্য করছেন সঠিক ফলাফল অনুযায়ী পরীক্ষা করা হলে জুলাই মাসে বাংলাদেশে দুই তৃতীয়াংশ মানুষ করোনা পজিটিভ পাওয়া যাবে। যার কিছু বাস্তবতা বাংলাদেশ থেকে ইতালিতে যাওয়া প্রবাসীদের করোনা পরীক্ষায় পাওয়া গেছে। যেখানে ৭০ শতাংশ বাংলাদেশের নেগেটিভ রিপোর্ট পজিটিভ পাওয়া গেছে সেখানে।
এতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ বিশ্ব কমিউনিকেশনের যুগে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। এমন খবর আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।
জনসম্মুখে প্রকাশ হচ্ছে স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনা। একে অপরের উপর দোষ চাপিয়ে দায়সারা জবাব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। যাতে হতাশ হচ্ছেন দেশের সচেতন মহল।
দেশের এমন চিত্র বিবেচনায় বলাই যায় জুনের মধ্যে ভাগ থেকে চলমান সময়ে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের মহামারী চলছে। প্রকৃতিগত ভাবে বাঙালীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকায় অন্যান্য দেশের তুলনায় মৃত্যু কম হচ্ছে। এটি স্বাস্থ্য বিভাগের সফলতা নয়, বরং দেশের মানুষের ইমিউনিটিইর সফলতাই বলা যায়।
আবুল হায়দার তরিক, লেখক ও সাংবাদিক, মোবাইল- ০১৭১৪৭৫২৪১১, ইমেইল- torikbd5@gmail.com